রাতের আঁধারে নদীতে ঢালা হচ্ছে বিষাক্ত কীটনাশক। নিমিষেই নিস্তেজ হয়ে পানিতে ভাসছে বাঘমাছ, মিরগা, চিংড়িসহ দেশীয় প্রজাতির বিরল সব মাছ। আর সেই মরা মাছ ধরতে সকাল থেকেই নদীতে নেমে পড়েছে শিশু থেকে বৃদ্ধ চলছে মশারি ও জাল দিয়ে মাছ কুড়ানোর প্রতিযোগিতা।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাইফলাইনখ্যাত ধলাই নদী এখন যেন পরিণত হয়েছে মাছের বিষাক্ত বধ্যভূমিতে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশ্যে আসা এই চিত্রে নদীর প্রাকৃতিক প্রতিবেশ যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি রান্না করে সেই বিষাক্ত মাছ খাওয়ায় সাধারণ মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীত ও শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই ধলাই নদীতে সক্রিয় হয়ে ওঠে অসাধু মাছ শিকারি চক্র। দ্রুত মাছ পাওয়ার লোভে রাতের বেলা নদীতে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত উপাদান বা রাসায়নিক ছড়িয়ে দেয় তারা। বিষের ঝাঁজে পরদিন সকাল থেকেই বাইং, গুলশা, মলা-ঢেলা ও পুঁটিসহ নদীজলে থাকা প্রতিটি জলজ প্রাণী ভেসে উঠতে থাকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর ঘাটে ঘাটে মাছ কুড়ানোর হিড়িক। বিপদ জেনেও পেটের তাগিদে কিংবা লোভে পড়ে এসব মাছ ঘরে তুলছেন অনেকেই। মাছ ধরতে আসা রাজন মিয়া ও মাহিন মিয়ার মতো অনেকেই অকপটে স্বীকার করেন, এই মাছ তাঁরা বাড়িতে নিয়ে রান্না করে খাবেন। তবে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁরা জানান, চক্রটিকে না থামালে নদী একদিন মাছশূন্য হয়ে যাবে।
স্থানীয় সচেতন তরুণ ওমর ও তানিম হাসানের অভিযোগ আরও কড়া। তাঁদের দাবি, বছরের পর বছর এই ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। প্রতিকার না পেয়ে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে, যার মাশুল দিচ্ছে ধলাই নদীর প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান।
এদিকে রান্না করা মাছ থেকেও ছড়াতে পারে নীরব বিষক্রিয়া এমনই অশনিসংকেত দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সাকুর আহমেদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাপে বা রান্নায় রাসায়নিক বিষ পুরোপুরি নষ্ট হয় না। এই বিষযুক্ত মাছ মানবদেহের কিডনি নষ্ট করে দিতে পারে, আঘাত হানতে পারে স্নায়ুতন্ত্রেও। যেকোনো মূল্যে এই মাছ খাওয়া নিষিদ্ধ করার তাগিদ দেন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয় বনিক বলেন, নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। নদীতে যাতে কেউ বিষ প্রয়োগ না করে, সে বিষয়ে কিছুদিন আগেই এলাকায় সচেতনতামূলক মাইকিং করা হয়েছিল। এরপরেও এমন ঘটনা অপ্রত্যাশিত। পুরো বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

