সারা দেশে যখন দেবী দুর্গার বোধন আর ষষ্ঠী পূজার দিন গোনা চলছে, তখন সবুজ চা পাতার দেশে আগেই বেজে উঠেছে শারদীয় আগমনীর ঢাক। মহালয়ার পরদিন থেকেই উৎসবের ভিন্ন রঙে সেজেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ইছামতি চা বাগান।
চিরাচরিত রীতির বাইরে গিয়ে পৌরাণিক শাস্ত্রীয় মহিমায় এখানে শুরু হয়েছে নয় দিনব্যাপী ব্যতিক্রমী ‘নবদুর্গা’ পূজা। নয় দিনে দেবীর নয়টি রূপের একক আরাধনা এমন অনন্য আয়োজন পুরো দেশেই বিরল।
রবিবার (১১ অক্টোবর) সকালে ইছামতি চা বাগানের মঙ্গলচণ্ডী সেবাশ্রম প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় উৎসবের এক অপূর্ব আবহ। ধূপ-ধুনোর সুবাস, পুরোহিতের ভরাট কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ আর ভক্তদের করজোড়ে উচ্চারিত প্রার্থনায় মুখর চারপাশ। প্রথম দিনেই ভক্তদের শ্রদ্ধার্ঘ্যে আরাধনা করা হয় দেবীর প্রথম রূপ ‘শৈলপুত্রী’র। লাল, হলুদসহ নানা বর্ণিল সাজে সেজে ভক্তরা বিশেষ করে তরুণী ও কিশোরীরা অঞ্জলি দেন দেবীর চরণে।
আয়োজকরা জানান, ২০১০ সালে শুরু হওয়া এই ব্যতিক্রমী উৎসব এবার ১৬তম বছরে পা দিল। সনাতন শাস্ত্রমতে নবরাত্রির প্রতিটি দিনে দেবী দুর্গার পৃথক রূপের পূজা করা হয়। মহালয়ার পরদিন থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবে পর্যায়ক্রমে আরাধনা হবে ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং নবমীতে সিদ্ধিদাত্রী রূপের।
পৌরাণিক এই ধারাটির চর্চা সাধারণ দুর্গাপূজায় সচরাচর দেখা যায় না। সেবাশ্রমের পুরোহিত দীপংকর ভট্টাচার্য বলেন, “শ্রীশ্রী চণ্ডীতে দেবীর যে নয়টি স্বতন্ত্র রূপের বর্ণনা রয়েছে, সাধারণ মানুষের কাছে তার মাহাত্ম্য অনেকটাই অজানা। প্রতিবছর আমরা প্রতিদিন একটি করে রূপের আরাধনা করে ভক্তদের সামনে দেবীর সেই নয়টি প্রকাশের দর্শন ও তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করি। মূল উৎসব শুরুর আগেই পূজার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ায় ইছামতির এই মন্দির এখন দেশের নানা প্রান্তের ভক্তদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজন ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশে ঠিক এই আঙ্গিকে নবদুর্গা পূজার আয়োজন সম্ভবত আর কোথাও নেই। ১৬ বছর ধরে আমরা এই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। আমাদের মূল প্রার্থনা একটাই দেবীর আশীর্বাদে যেন দেশ ও জাতির শান্তি এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
চা বাগানের শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতির মাঝে নয় রূপের দেবীর এই আরাধনা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; লোকজ বিশ্বাস, শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য আর আগাম উৎসবের এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে শ্রীমঙ্গলে।
