সীমানা পিলার ও প্রাচীন কয়েনের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ: গ্রেপ্তার ৪

প্রকাশিত: ১১:০৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০২৬

চা বাগানে মাটির নিচে লুকানো আছে ব্রিটিশ আমলের ‘অলৌকিক’ সীমানা পিলার ও অমূল্য প্রাচীন কয়েন; আন্তর্জাতিক বাজারে যার দর নাকি হাজার কোটি টাকা! রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার এমন প্রলোভনেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন এক ব্যবসায়ী ও তাঁর প্রবাসী স্বজনেরা। তবে কোটি টাকার ‘অলৌকিক ধন’ নিতে গিয়ে সিলগালা বাক্স খুলতেই চোখ ছানাবড়া—ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ফণা তোলা এক জ্যান্ত সাপ!

সেই সাপের পেছনেও জোড়া হয় ভৌতিক যুক্তি ‘টাকা লেনদেনের বিরোধে জিনের অসন্তুষ্টিতে বস্তুটি সাপে পরিণত হয়েছে, ২১ দিন পর আবার ঠিক হয়ে যাবে!’ অবিশ্বাস্য এমন নাটকের ফাঁদে ফেলে শেষ পর্যন্ত ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিয়েছিল প্রতারক চক্রটি।তবে শেষরক্ষা হয়নি তাদের। অলৌকিক সীমানা পিলার ও প্রাচীন কয়েন বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শ্রীমঙ্গল ও ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন রাজনগরের পণ্ডিত নগরের এসএম ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গলের উত্তর ভাড়াউড়ার মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুরের শ্যামলী এলাকার তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১) এবং মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।

অভিযানকালে আসামিদের কাছ থেকে কথিত ২০০ কোটি টাকা মূল্যের ১টি ‘এন্টিক পাওয়ার কয়েন’, প্রতারণায় ব্যবহৃত ১টি নোহা গাড়ি, ১টি পকেট রাউটার, ৮টি মোবাইল ফোন, ১০টি সিমকার্ড, ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর ১টি ভুয়া সনদপত্র, ৯৪ পাতার ভুয়া বিজনেস চুক্তিপত্র, ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ১০০ টাকা মূল্যমানের ৬টি ভুয়া স্ট্যাম্প, ৩টি চেকবই, ১টি ব্ল্যাংক কয়েন অ্যালবাম ও ১টি ডায়েরি জব্দ করা হয়।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রাজনগরের বালিসাহস্রো গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমকে (৩৫) তাঁর পরিচিত ইলিয়াছুর রহমান জানান যে চাতলাপুর চা বাগানে কোটি টাকার ব্রিটিশ ধাতব বস্তু রয়েছে। রহিমের বিশ্বাস অর্জনে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘ইউএস হেরিটেজ অকশন’-এর তথাকথিত বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর পরিচয়ে সামনে আসেন চক্রের মূলহোতা আখতারুজ্জামান। ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট তথাকথিত ‘এক্সপার্ট’ এনে চা বাগানে ভুয়া পরীক্ষা চালিয়ে বস্তুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করার নাটক সাজানো হয়।

হাজার কোটি টাকার লোভে রহিম তাঁর প্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানের মাধ্যমে চেকের মাধ্যমে ১ কোটি এবং পরবর্তীতে নগদ অর্থসহ মোট ২ কোটি ২১ লাখ টাকা তুলে দেন চক্রটির হাতে। ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর চক্রটি একটি সিলগালা বাক্স দিয়ে জানায়, দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করে বাক্স খুলতে হবে। কিন্তু কৌতূহলবশত বাক্স খুলতেই বেরিয়ে আসে একটি জ্যান্ত সাপ। সাপ পাওয়ার পর হতভম্ব রহিমকে প্রতারকরা বোঝায়, জিন এসে অলৌকিক বস্তুটি সাময়িকভাবে সাপে বদলে দিয়েছে। ২১ দিন পর তা আগের রূপ পাবে এমন আশ্বাস দিয়ে উল্টো আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে চক্রটি সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে গা-ঢাকা দেয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ‘Heritage Auction’, ‘Lockheed Martin’, ‘BlackRock’ ও ‘Microsoft’-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলত। মূলহোতা আখতারুজ্জামানসহ চারজন ২০২৩ সালেও একই কায়দায় প্রতারণার দায়ে ঢাকা ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা জানান, ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলার সূত্র ধরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে চক্রের মূলহোতাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার অবাস্তব প্রলোভন, সীমানা পিলার বা তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতার ধাতব বস্তুর লোভে পা না দেওয়ার জন্য সর্বসাধারণকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান তিনি।