মণ্ডপে মণ্ডপে তখনো ঢাকের বোল উঠছে, তবে সেই ধ্বনিতে আর আনন্দের চঞ্চলতা নেই; ছড়িয়ে পড়ছে এক চেনা বিষাদের সুর। দেবীর পায়ে শেষ ছোঁয়াটুকু দিয়ে আঁচলে চোখ মুছছেন ভক্তরা, আর ঠিক পাশেই একঝাঁক তরুণী মেতে উঠেছেন চিরন্তন সিঁদুর খেলায়। হাসিমুখের আড়ালে বিদায়ের দীর্ঘশ্বাস, এই দুইয়ের দোলাচলেই আজ বুধবার শেষ হলো বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
পঞ্জিকার হিসাব বলছে, এবার দেবীর গমনাগমন নৌকায়। কিন্তু ভক্তদের হৃদয়ে সেই হিসাব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাশে উমার ফিরে যাওয়ার চিরন্তন বাস্তবতা। পাঁচ দিন ধরে যে আলো, যে প্রাণস্পন্দন আর যে মিলনমেলা জমে উঠেছিল মৌলভীবাজারের অলিগলিতে, আজ বিসর্জনের শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে তা মিশে যাচ্ছে শান্ত নদীর জলে।
সকাল থেকেই জেলার প্রতিটি মণ্ডপে ছিল বিহিত পূজার ব্যস্ততা। এরপরই শুরু হয় দেবীবরণের আনুষ্ঠানিকতা। দেবীর মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে, সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে নারীরা শুরু করেন সিঁদুর খেলা। এ খেলা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং জীবনের মঙ্গল কামনায় একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানোর রঙিন সামাজিক পর্ব।
উৎসবের এই বিদায়লগ্নে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল জেলার সম্প্রীতির আবহ। ভিন্ন ধর্ম ও নানা মতের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি পুরো পূজাকে একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বক্ষণিক তৎপরতায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্ন।
মৌলভীবাজারের পুরোহিত প্রনয় চক্রবর্তী জানান, প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ আর ভক্তদের নিবিড় ভক্তি দুটো মিলেই এবার পূজার আবহ ছিল অসাধারণ। স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের আন্তরিক সহযোগিতায় কোনো ছন্দপতন ছাড়াই উৎসব সমাপ্তির পথে এগোচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে জেলা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুনীল কুমার দাশ বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা মৌলভীবাজারের সৌহার্দ্যের ঐতিহ্যকেই প্রমাণ করে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আমরা বিসর্জনের পর্বে পৌঁছেছি।
জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা (বিকেল ৫টা) মেনে দুপুর থেকেই শুরু হয় বিসর্জনের প্রস্তুতি। পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, বিসর্জনঘাটগুলো ছাড়াও পুরো জেলার স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর নজরদারি বলবৎ রয়েছে, যাতে প্রতিটি শোভাযাত্রা নিরাপদে সম্পন্ন হতে পারে।
ধূপের গন্ধ আর শঙ্খের প্রতিধ্বনির মাঝে দেবী প্রতিমা যখন ঘাটের দিকে এগোচ্ছে, ভক্তদের কণ্ঠে তখন ফিরে আসার সেই চিরচেনা আকুলতা আসছে বছর আবার হবে’। দেবী যাচ্ছেন বটে, তবে রেখে যাচ্ছেন সম্প্রীতি শান্তি আর শুভশক্তির এক অমলিন বার্তা।

