আফগানিস্তানকে উড়িয়ে টি-২০তে টাইগারদের শুভ সূচনা

প্রকাশিত: 8:50 PM, March 3, 2022
সংগৃহীত

খেলা ডেস্ক: ওয়ানডে সিরিজ জেতার পর আফগানিস্তানের বিপক্ষে এবার টি-২০ সিরিজ খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ দল।  ১০০ রানের আগেই সফরকারীদের উড়িয়ে দিল বাংলাদেশ।  টি-২০ সিরিজে ১-০ এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা।

বৃহস্পতিবার মিরপুর শের ই বাংলা স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টি-২০তে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন টাইগার অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।  আগে ব্যাট করে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৫৫ রান সংগ্রহ করে টাইগাররা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৯৪ রানে সব উইকেট হারিয়ে ৬১ রানের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সফরকারী আফগানিস্তান।

৩২ ম্যাচের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নাঈম আজ শুরুতে স্ট্রাইক দিয়েছিলেন অভিষিক্ত মুনিম শাহরিয়ারকে।

এরপর স্ট্রাইক পেলেন, তবে টিকতে পারলেন না বেশিক্ষণ। দ্বিতীয় ওভার করতে আসা ফজলহক ফারুকি প্রথম বলটা করেন ইনসুইংগিং ইয়র্কার। লাইন ধরতে পারেননি নাঈম। বল গিয়ে সোজা আঘাত হানে প্যাডে।

ফারুকি এরপর জোরালো এক আবেদনই করেছিলেন। তবে আম্পায়ার সাড়া দেননি তাতে। সোজা রিভিউ করে বসেন আফগান অধিনায়ক মোহাম্মদ নবী।

রিভিউতে দেখা যায় ব্যাটের সংযোগ হয়নি, বলও মিডল স্টাম্পের নিচের অংশে আঘাত হানতো। তাতে প্রথম সফলতা পায় আফগানরা। নাঈম ফেরেন ৫ বলে ২ রান করে। ১০ রানে প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

এ ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছে মুনিম শাহরিয়ারে ও টি-২০ তে অভিষেক হয়েছে ইয়াসির আলি রাব্বির। টি-২০ ফরম্যাটে বাংলাদেশের ৭৪ ও ৭৫তম খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক হলো মুনিম এবং ইয়াসিরের।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বলেই দারুণ লফটেড শটে বাউন্ডারি। দারুণ আভাস দিয়ে শুরু করলেন মুনিম শাহরিয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না অভিষেক রাঙাতে। পারলেন না খুব ঝড়ো ব্যাটিং করতেও।

শুরুর ওই বাউন্ডারির পর মুজিব উর রহমানকে টানা দুটি বাউন্ডারি মারেন মুনিম। কিন্তু পারেননি রশিদ খানের সামনে। ফ্লাইটেড ডেলিভারি একটু আগেভাগেই সু্ইপ করার চেষ্টা করেন ডানহাতি ব্যাটসম্যান। বল শেষ মুহূর্তে নেমে যায় আচমকা। শাফল করে সুইপ করার চেষ্টায় ব্যাটে-বলে করতে পারেননি মুনিম। এলবিডব্লিউয়ের আবেদনে আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার।

মুনিম রিভিউ নেন। কিন্তু বল লাগত মিডল স্টাম্পে। হারাতে হয় রিভিউ। মুনিমের অভিষেক ইনিংস শেষ ১৮ বলে ১৭ রানে।

চার নম্বরে নেমে দলকে টানতে পারলেন না সাকিব আল হাসান। বিপিএলে টুর্নামেন্ট সেরা হওয়া অলরাউন্ডার বিদায় নিলেন ৬ বলে ৫ রান করে। লেগ স্পিনার কাইস আহমেদ প্রথম ওভারেই পেলেন সাফল্য।

কাইসের ফ্লাইটেড বলে একটু আগেই সুইপ করার পজিশনে গিয়ে ব্যাট চালান সাকিব। একটু বাড়তি লাফিয়ে বল লাগে সাকিবের ব্যাটের ওপরের দিকে। সহজ ক্যাচ উঠে যায় শর্ট ফাইন লেগে। ক্যাচ নিতে একটুও বেগ পেতে হয়নি ফিল্ডার মুজিব উর রহমানকে।

এদিকে কাঈস আহমেদকে ডিপ মিড উইকেটে বিশাল ছয়ে যেন রানের ফোয়ারা ছোটানোর আভাস দিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। কিন্তু ১০ রানের বেশি করতে পারেননি টি-২০অধিনায়ক। ৭ বলে ১ ছয়ে তিনি এই রান করেন। আজমতুল্লাহ ওমরজাইয়ের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে তিনি ফেরেন। তিনে নামা লিটনকে কেউ সঙ্গ দিতে পারছেন না। মুনিম-সাকিবের পর এবার ফিরলেন মাহমুদউল্লাহ।

ফিফটির পর ইনিংসটিকে বেশি দূর টানতে পারলেন না লিটন। আউট হয়ে গেলেন দ্বিতীয় স্পেলে ফেরা ফজলহক ফারুকির বলে।

ফারুকির স্লোয়াল শর্ট ডেলিভারিতে বলের নিচে গিয়ে গায়ের শক্তিতে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করেন লিটন। কিন্তু মন্থর গতির কারণে টাইমিং হয়নি। শর্ট ফাইন লেগে সহজ ক্যাচ নেন আজমতউল্লাহ ওমরজাই।

লিটন আউট হলেন ৪৪ বলে ৬০ রান করে। সবশেষ টি-টোয়েন্টি ফিফটিতে ২০২০ সালের মার্চে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করেছিলেন ৪৫ বলে ৬০।
থিতু হয়েও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারলেন না আফিফ হোসেনও। লিটনের বিদায়ের পরপর তিনি আউট হয়ে গেলেন ২৪ বলে ২৫ রান করে।

আজমতউল্লাহ ওমরজাইয়ের ফুল লেংথ বল বৃত্তের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করেন আফিফ। কিন্তু শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারেননি ঠিকমত। তাতে জোর হয়নি শটে। কাভারে সহজ ক্যাচ নেন মোহাম্মদ নবি।

দ্রুত রান তোলার তাড়ায় শেষ ওভারে রান আউট ইয়াসির আলি চৌধুরি। টি-২০তে তার অভিষেক ইনিংস শেষ ৭ বলে ৮ রানে।

ইনিংসের শেষের আগের বলে দ্বিতীয় রানের চেষ্টায় রান আউট হন শেখ মেহেদি হাসান (৭ বলে ৫)। শেষ বলে শরিফুল ইসলামের ব্যাটের কানায় লেগে আসে একটি বাউন্ডারি। দলে ফেরার ম্যাচে তিনে নেমে ৬০ রানের ইনিংস খেলেন লিটন দাস।

আফগানদের সেরা বোলার দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নামা পেসার ফজলহক ফারুকি (২/২৭)। দুটি উইকেট নেন অভিষিক্ত আজমতউল্লাহ ওমরজাই। রশিদ খান যথারীতি ছিলেন সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলার।

শুরুর দিকে ধাক্কা সামলে শেষ পর্যন্ত কোনোরকমে দেড়শ ছাড়িয়ে ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৫৫ রান করে বাংলাদেশ।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারে বোলিংয়ে নাসুম। দ্বিতীয় বলে ক্যাচ তুলেছিলেন হজরতউল্লাহ জাজাই, কিন্তু পেছনে দৌড়ে গিয়েও বলটা হাতের নাগালে পাননি বোলার নাসুম, হলো এক রান। তবে এক বল পরই উইকেটের আনন্দে মেতে উঠলেন বাংলাদেশি স্পিনার। পেছনে সরে মারতে গিয়ে কাভারে ইয়াসির আলীর হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন গুরবাজ। তৃতীয় ওয়ানডেতে শতক হাঁকানো গুরবাজ এবার ফিরলেন কোনো রান না করেই।

এরপর তৃতীয় ওভারে এসে প্রথম তিন বলের ব্যবধানে ফেরালেন হজরতুল্লাহ জাজাই ও অভিষিক্ত দারউইশ রাসুলিকে।

দুই দফায় বেঁচে গিয়েও সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেন না হজরতউল্লাহ জাজাই। নাসুম আহমেদ ফুল লেংথ বল হাঁটু গেঁড়ে মিড অফের ওপর দিয়ে স্লগ করার চেষ্টা করেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। কিন্তু একটু আগেভাগেই ব্যাট চালানোয় টাইমিং হয়নি ঠিকমতো। মিড অফে সহজ ক্যাচ নেন মোহাম্মদ নাঈম শেখ। ৭ বলে ৬ রান করে আউট জাজাই।

আফগান টপ অর্ডারকে দাঁড়াতেই দিলেন না নাসুম আহমেদ। এবার তার শিকার অভিষিক্ত দারবিশ রাসুলি। অফ স্টাম্পের ওপর নাসুমের ঝুলিয়ে দেওয়া বল খানিকটা আলসে ভঙ্গিতে সুইপ করার চেষ্টা করেন রাসুলি। ব্যাটে-বলে হয়নি, বল ছোবল দেয় স্টাস্পে। রাসুলির অভিষেক ইনিংস শেষ ৬ বলে ২ রান করে।

মুস্তাফিজুর রহমানের বলে একটি বাউন্ডারির পরই জীবন পেলেন নাজিবউল্লাহ জাদরান। অফ স্টাম্পের বাইরে একটু লাফিয়ে ওঠা বল নাজিবউল্লাহর গ্লাভসে ছোবল দিয়ে উড়ে যায় পেছনে। কিপার লিটন ডাইভ দিয়ে দুই হাতে বল হাতে জমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বল জমাতে পারেননি গ্লাভসে।

তিন ওভারেই চার উইকেট হয়ে গেল নাসুম আহমেদের। গুঁড়িয়ে দিলেন তিনি আফগান টপ অর্ডার। তার চতুর্থ শিকার করিম জানাত।
শর্ট অব লেংথ বল হালকা টার্ন করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। করিম চেয়েছিলেন জায়গা বানিয়ে ড্রাইভ করতে। কিন্তু সেই জায়গা তাকে দেননি বোলার। টাইমিংও তাই হয়নি ঠিকমতো। শর্ট কাভারে সহজ ক্যাচ নেন শেখ মেহেদি হাসান।

টানা বোলিংয়ে চার ওভারের স্পেল শেষ করলেন নাসুম আহমেদ। দারুণ বোলিংয়ে স্পর্শ করলেন নিজের ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। তার বোলিং ফিগার ৪-০-১০-৪।

গত সেপ্টেম্বরে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামেই নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে নিয়েছিলেন ১০ রানে ৪ উইকেট।

১৯ ম্যাচের টি-২০ ক্যারিয়ারে তার ৪ উইকেট আছে আরও একটি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গত অগাস্টে ১৯ রানে ৪ উইকেট।

পানি পানের বিরতির পরই থেমে গেল আফগানদের প্রতিরোধের জুটি। সাকিব আল হাসানের বলে আউট হলেন মোহাম্মদ নবি।

সাকিবের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে ইনসাইড আউট খেলার চেষ্টা করেন নবি। কিন্তু টাইমিং ঠিকমতো করতে পারেননি, বল রাখতে পারেননি ফাঁকা জায়গায়। বরং সহজ ক্যাচ যায় কাভার সীমানায় আফিফ হোসেনের হাতে। ১৯ বলে ১৬ করে আউট হলেন নবি।
সাদা বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৪০০ উইকেট হয়ে গেল সাকিব আল হাসানের।

মোহাম্মদ নবি আউট হওয়ার পর আরেক থিতু ব্যাটসম্যান নাজিবউল্লাহ জাদরানরাও আউট হলেন সাকিবের বলে। দুই থিতু ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে আবারও বিপদে আফগানিস্তান।

বলটি অবশ্য খুব ভালো কিছু ছিল না। লেগ স্টাম্পের ওপর লেংথ বল, একটু ধীরগতির। নাজিবউল্লাহ চেষ্টা করেন গায়ের জোরে উড়িয়ে মারতে। শট খেলার মতোই বল। কিন্তু বেশি জোরে মারার চেষ্টায় হয়তো টাইমিংয়ে গড়বড় করে ফেলেন নাজিবউল্লাহ। আকাশে ওঠা বল স্কয়ার লেগে মুঠোবন্দি করেন মুনিম শাহরিয়ার। নাজিবউল্লাহ আউট ২৬ বলে ২৭ রানে।

রশিদ খানের সঙ্গে একরকম মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছিল শরিফুল ইসলামের। বাংলাদেশের তরুণ বাঁহাতি পেসার দারুণ এক বাউন্সারে নাড়িয়ে দেন রশিদকে। একটু পর রশিদ চেষ্টা করেন শোধ তোলার। কিন্তু লাভ হয়নি। জিতে যান শরিফুলই।

শরিফুলের অফ স্টাম্পের বাইরের বেরিয়ে যাওয়া বল উড়িয়ে মারেন রশিদ। কাভার-পয়েন্ট সীমানার একটু ভেতরে ক্যাচ নেন ইয়াসির। রশিদ খান আউট ৭ বলে ১ রান করে।

আফগানদের হয়ে একটু লড়াইয়ের চেষ্টা করছিলেন আজমতউল্লাহ ওমরজাই। তাকে থামিয়ে ম্যাচে নিজের প্রথম উইকেটের দেখা পেলেন মুস্তাফিজুর রহমান। মুস্তাফিজের লেংথ বল উড়িয়ে মারেন ওমরজাই। কিন্তু স্লোয়ার বলের গতিতে বিভ্রান্ত হন তিনি। বল উঠে যায় স্রেফ ওপরে। বৃত্তের ভেতরে বলতি মুঠোয় জমান মাহমুদউল্লাহ।

আউট হওয়ার আগে অবশ্য অভিষেক ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের ঝলক ওমরজাই। সাকিবকে বাউন্ডারির পর চার-ছক্কা মারেন শরিফুলকে। শেষ পর্যন্ত আউট হন ১৮ বলে ২০ রান করে।

এক ওভারে দুই উইকেট নিয়ে আফগানিস্তানের ইনিংস শেষ করে দিলেন শরিফুল ইসলাম। ওভারের প্রথম বলে চার মারেন কাইস আহমেদ, পরের বলেই তার ফিরতি ক্যাচ নেন শরিফুল। পরের বলে মুজিব উর রহমান মারেন বাউন্ডারি। আবারও পরের বলেই তাকে ফিরিয়ে দেন শরিফুল। আফগানিস্তান অলআউট ৯৪ রানে।

২৯ রানে ৩ উইকেট নিয়ে শেষ করলেন শরিফুল, এই সংস্করণে তার সেরা বোলিং।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

ফল : বাংলাদেশ ৬১ রানে জয়ী।

ম্যাচ সেরা : নাসুম আহমেদ (বাংলাদেশ)।

সিরিজ : দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৫১/৮ (মুনিম ১৭, নাঈম ২, লিটন ৬০, সাকিব ৫, মাহমুদউল্লাহ ১০, আফিফ ২৫, ইয়াসির ৮, মেহেদি , নাসুম ৩*; ফারুকি ৪-০-২৭-২, মুজিব ৩-০-২৪-০, রশিদ ৪-০-১৫-১, নবি ২-০-১৯-০, কাইস ২-০-২১-১, ওমরজাই ৪-০-৩১-২, করিম ১-০-৫-০)।

আফগানিস্তান: ১৭.৪ ওভারে ৯৪ (জাজাই ৬, গুরবাজ ০, রাসুলি ২, নাজিবউল্লাহ ২৭, করিম ৬, নবি ১৬, ওমরজাই ২০, রশিদ ১, কাইস ৮, মুজিব ৪, ফারুকি ০*; নাসুম ৪-০-১০-৪, মেহেদি ৩-০-১৭-০, মুস্তাফিজ ৩-০-১৯-১, শরিফুল ৩৪.-০-২৯-৩, সাকিব ৪-০-১৮-২)।