
ধলাই ডেস্ক: বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত। যুগ যুগ ধরে এ দেশের ইতিহাসে ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা লেখা আছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকেরা যুগ যুগ ধরে সম্প্রতি ও সৌহার্দের মধ্য দিয়ে পরস্পর মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। তাদের পরস্পরের মধ্যে যেমন রয়েছে হৃদ্যতা, আন্তরিকতা তেমনি অপর ধর্মের প্রতিও রয়েছে গভীর শ্রদ্ধাবোধ। এক ধর্মের অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের লোকজন অংশগ্রহণ করেন। এ জন্য বলা হয় ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’।
এদিক দিয়ে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশ। আবহমানকাল থেকে বাংলা ভূখণ্ডে নানা জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্ম মতের অনুসারীরা পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে মিলেমিশে একত্রে বসবাসের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য সংহত রেখেছে। সব ধর্মেরই অন্যতম মূল বাণী হলো মানব প্রেম ও মানব কল্যাণ। মানুষে মানুষে ধর্মে ধর্মে যতই ভেদাভেদ থাকুক না কেন সব ধর্মেরই মূল বাণী মানবতার কল্যাণ।
বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এদেশের সংবিধানের মৌল চেতনাকে সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর সরকার। যার যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে এটাই ধর্মের শিক্ষা। মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও মালিক এক। তার ধর্মও এক ও অভিন্ন। তার সব সৃষ্টির মাঝে মানুষ সর্বোৎকৃষ্ট। তার এ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি যেন নিজেদের মাঝে সাম্য, একতা, মানবতা এবং সহমর্মিতা প্রকাশের মাধ্যমে সহাবস্থানে বসবাস করেন এ শিক্ষাই সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন।
দেশের এই প্রান্তিক জনপদে এবারে ১৮২তম বর্ষ মহারাসলীলা পালিত হচ্ছে। যা একটি জাতির জন্য গর্বের। মণিপুরী সাংস্কৃতির আচার অনুষ্ঠান রীতি প্রথা নির্মল সংস্কৃতি দেশে সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারকে ঋদ্দ্ব করেছে। মণিপুরী গৌড়িও বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী এজন্য তাদের জীবন ধারা আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে রয়েছে এক বৈশিষ্ট্যময়তা – যা তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। মণিপুরী ধর্ম ও সংস্কৃতি একি সুত্রে গাঁথা। রাসলীলার ইতিহাস অনেক সুদীর্ঘ শ্রী কৃষ্ণের রাসলীলা মণিপুরী সমাজের চিরাচরিত ধর্মীয় উপাসনা। দারপযুগে বৃন্দবনের যমুনা পুলিনে পত্র পল্লভে ভুষিত নির্জন অরণ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণ রাধা ও তার সখীদের নিয়ে মধুর রাসলীলা করেছিলেন । পরবর্তীতে মণিপুরীরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নদ্রষ্ট হয়ে এই রাসলীলা প্রবর্তন করেন । তারই ধারাবাহিকহতায় মণিপুরী সমাজে প্রধান ধর্মীয় উৎসব হয়ে আসছে ।
মণিপুরী নৃত্য ও রাসনৃত্য সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে নতুন দিগন্তে সূচনা করেছে। বাংলাদেশের সকল সাফ গেইমস ও অন্যান্য সকল জাতীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা প্রদর্শন করে প্রশংসা অর্জন করেছে। বিশ্ব সাংস্কৃতিতে এই নৃত্য ও সাংস্কৃতিতে আলাদা একটি জায়গা করে নিয়েছে। প্রতি বছর কার্তিকের পূর্ণিমা রাতে অপূর্ব মাধুর্য্যমন্ডিত রাসলীলা উদযাপিত হয়ে আসছে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মণিপুরী নৃত্যগীতে মুগ্ধ হয়ে কবির প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে এই নৃত্য চালু করেন। দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার সংগ্রামের আহব্বানে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযোদ্ধে মণিপুরীরা অংশগ্রহণ করেছিল। অনেকে শহীদ হয়েছেন। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয় দেশের সকল কল্যাণ মূলক কাজে অংশগ্রহণ স্বদেশ প্রেমের উজ্জ্বল উদাহরণ। অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতির মহামিলনের আনন্দ ও রস আস্বাদনের অন্যতম উৎসব মণিপুরী মহারাসলীলা সবার অংশগ্রহণ সত্য সুন্দর একটি অনুষ্ঠান। সকল ধর্মে এক ধর্মাবলম্বী অন্য ধর্মাবলম্বীকে সম্মান করা বিদ্যমান। কোনো ধর্মই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বা বিশৃঙ্খলা শিক্ষা দেয়নি। প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে। ধর্মপালন কিংবা বর্জন ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার। বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চা এবং পরাধীনতার শৃংখলমুক্ত হওয়ার জন্য বিদেশি ও শৈর – শাসকবিরোধী আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বাংলার মানুষ বরাবর একাত্ম হয়েছে। সেসব সংগ্রামে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী কোনো আলাদা পরিচয়ই তাদের ছিল না। একটি সুখী সমৃদ্ধির বাংলাদেশের জন্য। বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেছিল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষ। আর সমৃদ্ধির বাংলাদেশে সম্প্রীতি রক্ষার মানসিকতায় সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক মনস্তাত্ত্বিকতা চিন্তায়-মননে সুন্দর মানসিকতায় প্রকাশ। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে ভিন্নতা থাকলেও বাংলার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। প্রাচীন, মধ্য, আধুনিক কোনো যুগেই এই সহ-অবস্থানের বন্ধন রয়েছে।
মণিপুরী মহারাসলীলা আজ সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। সকলে অংশগ্রহণে এই মহোৎসবে রচিত হবে সম্প্রীতির রাসলীলা ।
নির্মল এস পলাশ
সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিক।